বোবাদের জন্য যন্ত্র কান

আপনার সন্তান কি বোবা? শ্রবণ প্রতিবন্ধী? চিকিৎসায় কোন কাজ হচ্ছে না? আর টেনশন নেই। বিজ্ঞানের এক অসামান্য উদ্ভাবন ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট (Cochlear Implant) বা বায়োনিক কান এখন বাজারে এসে গেছে।

‘আমার সামীন আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। নাম ধরে ডাকলে ছুটে আসে, মা বলে। বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মা হিসেবে এ তো আমার পরম পাওয়া। এর বেশি কিছু তো আমার চাওয়ারও ছিলনা। দীর্ঘ ৬ বছর প্রতীক্ষার পর সন্তানের মুখে মা ডাক শুনতে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। সামীনের মুখে মা ডাক শুনে মনে হয়েছে আমি যেনো পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মা।’ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন সরকারী ইডেন কলেজের সহযোগী অধ্যাপিকা এবং দেশের প্রথম বায়োনিক কানের অধিকারী শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুর মা মিসেস সেলিনা আকতার।

শুনো বলি কানে কানে
কানে শোনা গেলেই তো কথা বলা শেখা যায়। প্রতিবন্ধী, বোবারা কানে শোনে না বলেই কথা বলতে পারে না। আর তাদের কানে শোনার ব্যাপারটি সারছে ইলেকট্রনিক্স কান। যার বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে বায়োনিক কান। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট’। এটি এমন এক ধরনের প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে সরাসরি অন্তঃকর্ণের ককলিয়ার নার্ভে শব্দ সংকেত পাঠিয়ে অতি গুরুতর শ্রবণ প্রতিবন্ধীরাও বিশেষত হিয়ারিং এইড যাদের কোন কাজেই আসে না তাদের সফলভাবে শব্দ যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। জন্মগত ত্রুটি, রোগ অথবা দূর্ঘটনাজনিত কারণে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ, বহিঃকর্ণ এবং মধ্যকর্ণ সম্পন্ন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কানের বাইরে দিয়েই এ যন্ত্রের মাধ্যমে শ্রবণক্ষম হতে পারে। এ যন্ত্রের সাহায্যে ইয়ার ক্যানাল ছাড়াই শব্দ সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছে এবং শ্রবণ অনুভূতির সৃষ্টি করে। ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টে প্রধানত দু’টো অংশ রয়েছে। একটি অংশ শরীরের ভিতর থাকে, আরেকটি থাকে বাইরে। বাইরের অংশে আবার তিনটি যন্ত্রাংশ কাজ করে। মাইক্রোফোন স্পিচ প্রসেসর এবং ট্রান্সমিটার। মাইক্রোফোন এবং ট্রান্সমিটারকে একত্রে হেডমেট বলা হয়। স্পিস প্রসেসরকে একটি ফিতা বা স্ট্র্যাপের সাহায্যে পিঠে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আর শরীরের ভিতর থাকে দু’টি যন্ত্রাংশ। যাকে বলে ডিকোডার এবং ইলেকট্রোড।

কিভাবে সম্ভব?
গোটা যন্ত্র বেশ কয়েকটি ধাপে এর কাজ সম্পন্ন করে। মাইক্রোফোন শব্দ গ্রহণ করে এবং স্পিচ প্রসেসর পৌঁছে দেয়। স্পিস প্রসেসর এ শব্দ প্রয়োজন অনুযায়ী বাছাই এবং কোডিং করে ট্রান্সমিটারে পাঠায়। ট্রান্সমিটারে বাছাইকৃত শব্দ সংকেত বাইরে থেকেই মাথার চামড়ার নিচে অবস্থিত ডিকোডারে পৌঁছে দেয়। রিসিভিং ডিকোডার ট্রান্সমিটার কর্তৃক প্রেরিত শব্দ সঙ্কেতকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে। শব্দের এ রূপান্তরিত বৈদ্যুতিক সংকেত ইলেকট্রোডকে কার্যকর করে এবং শ্রবণের স্নায়ুতন্ত্রগুলোকে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। স্নায়ুতন্ত্রগুলো এ সকল উদ্দীপনা মস্তিষ্কে বয়ে নিয়ে যায় এবং শ্রবণ অনুভূতির সৃষ্টি করে। এ যন্ত্রটি সংস্থাপনের পর পর চারিদিকে শব্দকে গন্ডগোল, হৈ চৈ এর মতো মনে হয়। তবে সময় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শব্দ উপলব্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের শব্দের পার্থক্য নিরুপণ করা সম্ভব হয়। অনেকটা ছোট শিশুদের শব্দ এবং কথা শেখার মতো হয়।

যন্ত্র কান
তবে আট বছরের বেশি বয়সী শিশুদের বেলায় এ যন্ত্র আশানুরূপ ফলাফল নাও দিতে পারে। কেননা আট বছরের মধ্যে কথা বা যে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে না পারলে তাদের ক্যারিংস বা স্বরযন্ত্র ধীরে ধীরে দৃঢ় হয়ে যায়। শিশু ছাড়া বড়দের জন্যও এটি সহায়ক হবে যদি তিনি লিপরিডিং বা অন্য কোন উপায়ে যে কোন ধরনের কিছু শব্দ উচ্চারণ করে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। এছাড়া রোগ বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে যে কোন বয়সী ব্যক্তির কানের পর্দা ফেটে গেলে বা বহিঃকর্ণ থেকে মধ্যকর্ণ বা অন্তঃকর্ণ পর্যন্ত কোন স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে এ যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে সংকেত পাঠিয়ে সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়। আর তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের সম্পূর্ণ উপযুক্ত থাকবেন তিনি। এ যন্ত্রটি সংস্থাপনের পরে আন্তরিকতা ও নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে কথা শোনা এবং বলার অনুশীলনের ওপরও এর সুবিধা অনেকাংশে বেড়ে যাওয়া নির্ভর করে। এ যন্ত্র ব্যবহার করে প্রায় সকল প্রকার খেলাধুলায় এমনকি সাঁতারেও অংশ নেয়া যায় স্বচ্ছন্দ্যে। তবে কুস্তি, মুস্টিযুদ্ধ, ফুটবল, রাগবি ইত্যাদি খেলা বিপজ্জনক হতে পারে। এছাড়া এ যন্ত্র ব্যবহারে তেমন কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত চিহ্নিত হয়নি।

শেখ আনোয়ার
আর তাই ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট বা বায়োনিক কানের এই উদ্ভাবন গোটা আধুনিক বিশ্বের শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্যই বিজ্ঞানের এক অসামান্য আশীর্বাদ। শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের নৈঃশব্দের জগতে বায়োনিক কান সৃষ্টি করতে চলেছে এক ছন্দময় সুরের আলোড়ন।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Loading...